গল্প কার না ভালো লাগে?
ছোটোবেলায় পড়েছিলাম উপেন্দ্রকিশোরের লেখা এক রাজার গল্প। গল্প শোনার তাঁর খুব শখ ছিলো, কিন্তু কেউ তাকে গল্প শুনিয়ে তৃপ্ত করতে পারতো না। রাজামশাই ঘোষণা করে দিলেন, যে তাঁকে গল্প বলে খুশি করতে পারবে তাকে তিনি অর্ধেক রাজত্ব দেবেন। কিন্তু, গল্প বলতে এসে খুশি করতে না পারলে কান কেটে নেবেন।
অর্ধেক রাজত্ব বড় লোভনীয়। অনেকেই আসতো রাজাকে গল্প শোনাতে। সবার গল্পই সুন্দর বাঁধনে বাঁধা। একসময় শেষ হয়ে যেতো। রাজা বলতেন, “তারপর?” রাক্ষস মরে গেলো। “তারপর?” তারপর রাজপুত্র রাজকন্যাকে নিয়ে দেশে ফিরে গেলেন। “তারপর?” তারপর আমার কথাটি ফুরোলো, নটে গাছটি মুড়োলো। নটে গাছটি মুড়োলে গল্প শেষ হয়ে যায়, কিন্তু রাজামশাইয়ের ‘তারপর’ শেষ হতো না। অতএব কান কাটা যেতো। কান কাটা গেলে কেমন দেখায় তা কল্পনা করে দেখলাম। খুবই বিমূর্ত মনে হলো।
তারপর রাজার গল্প শোনার কী হলো?
অবশেষে এক নাপিত এলো। অবশেষে যখন, তখন বোঝাই যাচ্ছে এই নাপিতই রাজাকে গল্প শুনিয়ে অর্ধেক রাজত্ব পেয়ে যাবে। নাপিত নাকি খুব কুঁড়ে ছিলো, কিন্তু তার থেকেও বেশি চালাক। ঠিক যেমন আমরা সবাই হতে চাই। কিন্তু আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নাপিতের সেই গল্পটা। গল্পটার চরিত্রগুলোর মধ্যে কিন্তু কুঁড়েমি ছিলো না।
ঠিক হলো, নাপিত তার কানকে বাজি রাখতে রাজি। কিন্তু সে যতক্ষণ গল্প বলবে, রাজামশাই তাকে থামতে বলতে পারবেন না। সেটা বললেই রাজা হেরে গেলেন।
————————
রাজামশাইয়ের মতো আমরাও গল্প শুনতে ভালোবাসি।
আমরা গল্প শুনেছি, টমাস এডিসন ইলেকট্রিক বাল্ব তৈরি করতে গিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়েছিলেন।
— তারপর?
কার্বন, প্লাটিনাম, নারকেলের সুতো, সব কিছু চেষ্টা করে শেষে বাঁশের এক উপাদান দিয়ে দশ হাজার বার চেষ্টা করে তবে সফল হয়েছিলেন।
অর্থাৎ কিনা — ব্যর্থতা হলো সাফল্যের পথের এক একটা সিঁড়ি মাত্র।
————————
নাপিত গল্প শুরু করলো — এখান থেকে অনেক দূরে এক দেশ আছে।
সঙ্গে সঙ্গে রাজামশাই বলে উঠলেন, “তারপর?”
সেখানে একসের ধান বুনলে দশমণ ধান হতো।
একবার এত ধান হলো সে আর কি বলবো।
রাজামশাই বলতে থাকলেন, “তারপর, তারপর?”
সেই ধান রাখার জন্যে যে গোলা তৈরি হয়েছিলো কি বলবো! তার একধার থেকে অন্যধার দেখা যেতো না।
— “তারপর?”
সেই ধানের খবর পেয়ে এত পঙ্গপাল এলো, যে আকাশ ছেয়ে গেলো। চলবার জো নেই, শ্বাস টানলেও নাকি ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল নাকে ঢোকে।
রাজামশাই বলে উঠলেন, “তারপর? তারপর?”
নাপিত বলে চললো, কিন্তু সেই গোলা কি যেমন তেমন করে গড়া? সে একেবারে নিশ্ছিদ্র দুর্গ। দশদিন বেটারা বন্ বন্ করে গোলার চারধারে ঘুরে বেড়াল, বেড়ার কোনখানে একটাও বিঁধ বার করতে পারল না।
— “তারপর? তারপর?”
তারপর এগার দিনের দিন কয়েকটা ডানপিটে ছোকরা পঙ্গপাল খুঁজে খুঁজে কোত্থকে গিয়ে একটা বিঁধ বার করেছে, অনেক ঠেলাঠেলি করলে তা দিয়ে ভিতরে ঢোকা যায়।
— “তারপর? তারপর?”
তখন তাদের পালের গোদাটা এসে সেই বিঁধের মুখে বসে বলল, ঠ্যাল্ ত রে বাপু-সকলে তোরা সবাই মিলে, দেখি, ভিতরে ঢুকতে পারি কি না।।
— “তারপর?”
তারপর,ওঃ সে কি বিষম ঠেলাঠেলি! গোদা বেটা চ্যাপ্টা হয়ে গেল, শেষে অনেক কষ্টে, অর্ধেক ছাল বাইরে রেখে তবে গিয়ে ভিতরে ঢুকল।
— “তারপর?”
ঢুকে একটি ধান মুখে করে নিয়ে, বিঁধের কাছে এসে বলল, এবারে আমাকে টেনে বার কর।
— “তারপর?”
ওহ! সে কি টানাটানি! আর-একটু হলেই বেটা ছিঁড়ে যেত যা। যা হোক অনেক কষ্টে সে ধানটি নিয়ে বাইরে এল।
————————
এডিসনের বাল্ব তৈরির দু-লাইনের গল্পটা চমৎকার হতে পারে, কিন্তু পুরো সত্যি নয়। কিছুটা সত্যি রূপ দিতে হলে গল্পটা কেমন হয়?
১৮৩৫ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পর থেকেই বিজ্ঞানীরা বাল্ব, বাল্বের ভিতরের ফিলামেন্টের উপাদান, আর ভিতরের বাতাসের উপস্থিতি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে থাকেন। সেই সময় থেকেই বাল্ব তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু সেগুলো ছিলো খুবই ক্ষণস্থায়ী, আর খরচসাপেক্ষ।
এডিসন চেয়েছিলেন এমন ফিলামেন্ট তৈরি করতে যা অক্সিজেন ছাড়া ইলেকট্রিক শক্তিতে আলো দেবে, সস্তা হবে, আর অনেক বেশিক্ষণ জ্বলবে, যাতে সাধারণ মানুষ তা কিনে ব্যবহার করতে পারে। ১৮৭৬ সাল নাগাদ তিনি ও তার দল নানারকম উপাদান নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করলেন।
অধিকাংশ পরীক্ষাতেই দেখা গেলো বাল্বের ফিলামেন্ট বেশিক্ষণ টেকে না। প্রথম দিকে তাঁরা কার্বন ফিলামেন্ট দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন। তারপর প্লাটিনাম ব্যবহার করে দেখলেন।
— তারপর?
তারপর আবার কার্বনেই ফিরে এলেন। ১৮৭৯ সাল নাগাদ তারা কার্বন আর সুতির কাপড় দিয়ে তৈরি এমন ফিলামেন্ট তৈরি করতে পারলেন যাতে তাই দিয়ে বাল্ব সাড়ে চোদ্দ ঘন্টা পর্যন্ত জ্বলে।
————————
রাজামশাই পঙ্গপালের গল্প শুনতে থাকলেন। “তারপর?”
নাপিত বলে চললো, তারপর আর-একটা বেটা গিয়ে বসেছে সে বিঁধের মুখে, আর তেমনি ঠেলাঠেলির পর ভিতরে ঢুকছে, আর একটি ধান নিয়ে তেমনি টানাটানির পর বাইরে এসেছে।
— “তারপর?”
তারপর আরেক বেটা। সেও অনেক কষ্টে গিয়ে ভিতরে ঢুকেছে, আর একটাই ধান নিয়ে যা হোক তা হোক করে বেরিয়ে এসেছে।
— “তারপর?”
আরেক বেটা। সেও … … একটাই ধান নিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
— “তারপর?”
আরো এক বেটা। সেও …. ।
————————
মাত্র সাড়ে চোদ্দ ঘন্টা জ্বলবে এমন বাল্ব মানুষের ব্যবহারের পক্ষে যথেষ্ট নয়। এডিসন আর তার সহকর্মীরা হাল ছাড়লেন না। আরো পরীক্ষা করতে থাকলেন। এক সময় এডিসন বুঝলেন বাঁশের উপাদান তাঁদের কাজে লাগতে পারে। তিনি জাপানে একজনকে পাঠালেন নানা ধরনের বাঁশ যোগাড় করতে।
বাঁশ নিয়ে পরীক্ষা শুরু হলো। এক রকম উপাদান নিয়ে ফিলামেন্ট তৈরির চেষ্টা হলো। কিন্তু আগের থেকে ভালো কাজ হলো না।
— তারপর?
তারপর আরো এক রকম বাঁশের উপাদান নিয়ে। তাতেও হলো না।
— তারপর?
তারপর আরো এক রকম।
— তারপর?
————————
রাজামশাই ক্লান্ত হয়ে এসেছিলেন। তবু বললেন, “তারপর?”
তারপর আরো এক বেটা। সেও ….
সন্ধ্যে পর্যন্ত এই শুনে রাজামশাই আর থাকতে না পেরে বললেন, “আরে, আর কত বলবে? এখানো কি শেষ হল না?” নাপিত বিনয়ের সঙ্গে বোঝালো যে সবে মাত্র কয়েকটা পঙ্গপাল কয়েকটা ধান বের করেছে, এখনো তো আকাশ ভর্তি পঙ্গপাল, আর প্রায় গোটা ধানের গোলাই বাকি। রাজামশাই কথা দিয়েছিলেন পুরোটা শুনবেন, তাই কিছু বলতে পারলেন না।
রাজামশাই নাকি আরো দুদিন পঙ্গপালের পরিশ্রমের কথা শুনেছিলেন, তারপর হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। চালাক নাপিত অর্ধেক রাজত্ব পেয়ে গিয়েছিলো।
————————
এডিসন লিখেছেন, অন্তত ছ-হাজার উদ্ভিজ পদার্থ, আশি ধরনের বাঁশ-জাত উপাদান নিয়ে পরীক্ষা করার পরে তাঁরা এমন বাল্ব তৈরি করতে পেরেছিলেন যা ১২০০ ঘন্টা পর্যন্ত জ্বলতে পারে। সেই বাল্বই এডিসনের বাল্ব নামে পরিচিত হয়েছিলো।
তিনি সেইখানেই থেমে যাননি। বাল্বের উপাদান আর বিদ্যুত উৎপাদনকে উন্নত করতে তিনি আরো অনেক বছর চেষ্টা করে গেছেন, অনেক উন্নতিও করেছেন।
————————
আমরা গল্প শুনতে ভালোবাসি। সত্যিটার মধ্যে দিয়ে যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। গল্প আকর্ষণীয়। গল্পের নাপিত কুঁড়ে, আর চালাক। এক চালাকিতে বাজিমাত। তার গল্পের পঙ্গপালগুলো কিন্তু কুঁড়ে ছিলো না।
নিউটন নাকি গাছের তলায় বসে বসে আপেল পড়তে দেখে গ্রাভিটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। কিন্তু আমরা জানিনা যে তার আগে তিনি কতদিন ধরে কতরকম চিন্তা ভাবনা আর চেষ্টা করেছিলেন।
অনিল কুম্বলে ৬১৯ টা উইকেট নিয়েছেন। আমরা মনে রাখিনা তার জন্যে যে চল্লিশ হাজারের বেশি বার বল করেছেন, আর কত হাজার বল নেটে দিনের পর দিন অভ্যেস করেছেন? কতবার চার-ছক্কা খেয়েছেন?
যখন ছোটো ছিলাম, কলেজ-ছাত্র, তখন একটা আলোচনা সভায় গিয়েছিলাম। আমাদেরই ডিরেক্টর প্রফেসর শেষাদ্রি ছিলেন অন্যতম প্রধান বক্তা। রয়াল সোসাইটির ফেলো। সম্ভবত তখনকার জীবিত ভারতীয়দের মাত্র দু-তিন জনের মধ্যে একজন। আমাদের এক বন্ধু সাহস করে তাকে প্রশ্ন করেছিলো, “What does it take to become a great mathematician?”
ছোটবেলা থেকে জানি বুদ্ধির জয়জয়কার। উত্তরের মধ্যে সেই রকম কিছু আশা করেছিলাম সবাই।
প্রফেসর শেষাদ্রি ছোট্ট করে শুধু বলেছিলেন — “Hard work.”
গোটা হলঘর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিলো। তবে কজনের মাথায় ভালোভাবে ঢুকেছিলো জানিনা। আমাদের উপলব্ধির বাইরেই ছিলো তখন।
গল্পের মোহিনী মায়ায় আমরা ভুলে থাকি। ভুলে থাকতে পছন্দও করি।
No comments:
Post a Comment